Recent Articles
মুক্তিযুদ্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুক্তিযুদ্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০১৬

বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০১৬ - 0 Comments

utopia-hasanat-abdul-hye.jpgমুক্তিযুদ্ধের আগে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাবলীর পটভূমিতে লেখা হয়েছে এই উপন্যাসটি। একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্ররা, বিশেষ করে প্রধান চরিত্র মুঈন। মুঈন সমর্থন পেয়েছে তার বিদেশি স্ত্রীর মিতার কাছ থেকে এই প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের উত্থানের আগেই জীবনযাপনের জন মুঈন গড়ে তুলেছে কম্যুন ব্যবস্থা। সদস্য হিসেবে পেয়েছে সমমনা কিছু মানুষকে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ইউটিপিয়ার আদর্শ ক্রমাগত মার খেয়েছে, কিন্তু মুঈনের আশাবাদ তার জন্য তিরোহিত হয়নি। সমাজের বৃহত্তর পরিবেশে মূল্যবোধের অবক্ষয় তাকে নিরুৎসাহিত করেনি ইউটোপিয়া প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা থেকে। তবে তার মনে এক সময় প্রশ্ন জাগে তার মৃত্যুর পরে কী টিকে থাকবে? এমন সময় এক যুদ্ধশিশুকে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে সুমন ও সুমী। এরপরে সেই যুদ্ধশিশু যে কিনা এখন যুবক, তার হাতে কম্যুন ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে ইউটোপিয়ার সীমিত দৃষ্টান্ত হয়ে, এই নিশ্চিতি পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুঈন। তাকে আরো আশ্বস্ত করে জীবনসঙ্গী মিতা যে প্রবাস থেকে চলে আসবে বলে জানায়। এরপরের বাস্তবতাও উঠে এসেছে এই আখ্যানে।

Download

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০১৫

রক্তাক্ত বাংলা - প্রকাশক: মুক্তধারা (১৯৭১ ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে রচিত প্রবন্ধগুচ্ছ)

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০১৫ - 0 Comments

শনিবার, ২৭ জুন, ২০১৫

ডেড রেকনিং: ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি - শর্মিলা বসু

শনিবার, ২৭ জুন, ২০১৫ - 0 Comments

258_1ডেড রেকনিং: ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি (ইংরেজি: Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War) শর্মিলা বসু রচিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক বিতর্কিত একটি বই।

বইটি ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে। লেখক তার নিজস্ব গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে বইটি রচনা করেছেন। যুদ্ধকালে মানবিক বিপর্যয়ের দিকটি তিনি উপস্থাপন তুলেছেন।

বইটিতে তিনি দাবি করেছেন যে, পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যে ব্যাপক হত্যাকান্ড ও ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়ে থাকে তা অনেকাংশে অতিরঞ্জিত। বাংলাদেশ ও ভারতেররাজনৈতিক স্বার্থেই এই অতিরঞ্জন বলে তিনি দাবি করেছেন। পাকিস্তানীদের মধ্যে যারা ১৯৭১-এর পাকিস্তানীদের চালানো গনহত্যার সমালোচনা করে বই লিখেছেন, তাদের বর্ননাকে বসু 'সীমাবদ্ধ' আখ্যা দিয়েছেন। যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের বর্ণনার সাথে পাকিস্তানীদের বর্ণনার অমিল রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বসু পাকিস্তানীদের বর্ণনাকে বাংলাদেশীদের বর্ণনা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য ব্যবহার করেছেন। যেসব বিদেশী সংবাদ প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে, তাদের ব্যপারে বসু বলেছেন, "বিদেশী সংবাদ প্রতিবেদন সবসময় সুষমভাবে নির্ভরযোগ্য নয়"।

ডাউনলোড করুন বইটি

শনিবার, ২০ জুন, ২০১৫

একাত্তরের ডায়েরী - সুফিয়া কামাল

শনিবার, ২০ জুন, ২০১৫ - 0 Comments

Ekattorer Dairy - Sufia Kamal 2১৯৭১ সালে লেখা সুফিয়া কামালের দিনলিপিতে উঠে এসেছে একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের নানা মুহূর্ত। যা ওই সময়ের আতঙ্কগ্রস্ত, বিধ্বস্ত জীবনকে উপলব্ধি করতে পাঠকদের সহায়তা করে। এ দিনলিপি লেখা প্রসঙ্গে সুফিয়া কামাল লিখেছিলেন ‘মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস আমি বারান্দায় বসে বসে দেখেছি পাকিস্তানী মিলিটারীর পদচারণা। আমার পাশের বাসায় ছিল পাকিস্তানী মিলিটারীরর ঘাঁটি। ওখানে দূরবীন চোখে পাকবাহিনীর লোক বসে থাকতো। রাস্তার মোড়ে, উল্টো দিকের বাসায় সবখানে ওদের পাহারা ছিল।’

ডাউনলোড করুন 

শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০১৫

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান - সালাম আজাদ

শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০১৫ - 0 Comments

page001 (4)১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ, প্রকৃত বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে হাত বাড়িয়েছিল ভারত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ থেকে ৯৮৯৯৩০৫ জন শরণার্থী ভারতের ভূখণ্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। প্রায় এক কোটি এই শরণার্থীকে ভারতের জনগণ ও সরকার হাসিমুখে আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করে। শুধু তাই নয়-মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে। এসব কাজে তখন ভারতকে খরচ করতে হয়েছিল সাত হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর ভূমিকা রাখতে ভারতকে হারাতে হয়েছিল বহু অফিসার ও সৈনিককে। ১৯৭১ সালে পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গন মিলে শহীদ ভারতীয় সৈন্যের সংখ্যা ৩৬৩০ জন, নিখোঁজ ২১৩ জন এবং আহত ৯৮৫৬ জন। যাঁদের রক্ত এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে মিশে রয়েছে।


স্বাধীনতা ’৭১ - কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম


 Capture
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের নাম এক অবিস্মরণীয় স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত। সীমান্তের অপরপারে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে নয় বরং পৃথিবীর দুর্জয় অথচ ঘৃণ্যতম হানাদার পাক বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র চল্লিশ মাইল দূরে চারিদিকে শত্রুবেষ্টিত অধিকৃত এলাকায় এক মুক্তিকামী তরুণ আবুদল কাদের সিদ্দিকী পরবর্তীকালে যিনি ‘টাইগার সিদ্দিকী’ নামে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন তিনি দেশের মাটিতে জনগণের মধ্যে অবস্থান করে স্বীয় অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস, অভূতপূর্ব রণনীতি ও রণকৌশল এবং বিরল সামরিক প্রতিভাবলে গড়ে তুলে ছিলেন সতেরো হাজার সুদক্ষ মুক্তিযোদ্ধা ও সত্তর হাজার স্বেচ্ছাসেবকের এক বিরাট ও বিশাল বাহিনী; তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন মুক্তাঞ্চলের চল্লিশ লক্ষ মানুষকে প্রকৃতপক্ষে পরিণত করেছিলেন এক একজন দেশপ্রেমিক মুক্তি যোদ্ধায়, অসংখ্য যুদ্ধে মোকাবিলা করেছিলেন বহু বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও সর্বাধনিত অস্ত্র সজ্জিত বর্বর হানাদার বাহিনীর সঙ্গে.. যার নাম শুনে সেই দুঃসহ রক্ত ঝরাদিনগুলোতেও আঁতকে উঠতো রক্ত পিপাসু দস্যুরা, এমনকি যার অসাধারণ রণনৈপুণ্যর ফলে মিত্রবাহিনীর পক্ষে ঢাকা শহরের পতন ঘটাতে তাঁদের পরিকল্পিত সময় ও পথের পরিবর্তন ঘটেছিল সেই টাইগার সিদ্দিকীর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিনটি থেকে শেষ অধ্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার বিশদ বিবরণ বিবৃত হয়েছে। ‘আমি যদি হুকুম দিবার না পারি তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পোড়ো’ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের আহবান বাস্তবে রূপ দিয়েছিল যে ‘কাদেরীয়-বাহিনী’ তাদেরই প্রাণপ্রিয় সর্বাধিনায়ক বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের কিংবদন্তীর মহানায়ক ‘টাইগার সিদ্দিকীর রোমাঞ্চকর অথচ বস্তুনিষ্ঠ কাহিনী এই বইয়ের পাতায় পাতায় বিবৃত।



জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা - শহীদুল জহির

71.1 (1)শহীদুল জহিরের প্রথম উপন্যাস “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা”-কে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিশেবে চিহ্নিত করা যায় না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতাবিরোধী কু-শক্তির উথানের সাথে একজন একজন বোনহারা ভাই কিংবা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাওয়া ভয়াবহ সময়ের একজন মানুষ ও তাঁর পরবর্তী স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির মাথাচাড়া দেয়ার প্রত্যক্ষ দর্শকের মনস্তত্ত্ব নিয়েই এই উপন্যাস। যুদ্ধের বিবরণের চেয়ে যুদ্ধের মনস্তত্ত্ব- মহীবুল আজিজ তাঁর লেখায় উল্লিখিত উপন্যাস সম্পর্কে এ-মতই ব্যক্ত করেছেন। একটা মহল্লার প্রেক্ষাপটে তিনি যেভাবে পুরো যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং যুদ্ধকালীন সব ধরণের মানুষের মানসিক ক্রিয়ার সচল উপস্থাপন করেছেন, তাতে তিনি শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছেন বলে আমার বিশ্বাস। বাঙলা সাহিত্যে ভিন্ন ধারার লেখক নামে যে কয়জন শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক নীরবে আসন গেঁড়ে বসেছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদুল জহির অগ্রগামী- সেটা হোক তাঁর নতুনতর ভাষাশৈলী কারণে, আর পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা ব্যবহারে একজন সফল সাহিত্যিক হিশেবে। তাঁর উপন্যাস পড়তে গেলে নতুন পাঠকদের বরাবরই একটু হোঁচট খেতে হয়, একটু হয়তো ধাঁধায় পড়ে যেতে হয়- কিন্তু যখন আস্তে আস্তে আমরা প্রবেশ করি তাঁর রচনার ভেতরে, তিনি এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করে রাখেন। বাঙলা সাহিত্যে তাঁর যদি তাঁর পূর্বসরী খুঁজে বের করার প্রয়াস চালানো হয়, তাহলে বোধহয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাই সর্বপ্রথমে আসবে। এদের দু’জনের মধ্যেও শহীদুল জহিরের ওপর প্রভাব ওয়ালীউল্লাহ’র বেশী, আর ওয়ালীউল্লাহই হয়তোবা প্রথম ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমাজের প্রসঙ্গটি দেখনোর চেষ্টা করেছিলেন এবং সেই বৈশিষ্ট্যটা “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা” বইয়ের ভেতর দিয়েও মূর্ত হয়ে উঠেছে।

উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট ১৯৮৫ সালের এবং উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে, সে দশকে যখন প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতাবিরোধীরা আবার নিজেদের আসন প্রতিষ্ঠা করছে এই দেশে। লেখক তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সেই দশকের অস্থিরতা থেকেই তিনি উপন্যাসটি লেখার তাগিদ অনুভব করেন। সেই সময়ের উদ্দেশ্যে কি কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন,


ভোরবেলায় ঘন
কুয়াশার তাঁবুতে আচ্ছন্ন চোখ কিছুটা আটকে গেল তার
মনে হয় সে যেন উঠেছে জেগে সুদূর বিদেশে
যেখানে এখন কেউ কারো চেনা নয়, কেউ কারো
ভাষা ব্যবহার আদৌ বোঝে না; দেখে সে
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।

শহীদুল জহিরের লেখার তরিকা অদ্ভুত, গল্পের ভেতরে তিনি চলাচল করেন অনায়াসে, একটা সময়কে উপজীব্য করে ঘুরেফিরে বেড়ান নানা সময়ে। আবদুল মজিদ নামের একজন ব্যক্তির দ্বারা উপন্যাসটি সূচনা, যার পায়ের স্যান্ডেল প্রাণের এক অন্তর্গত কারণে ছিন্ন হয়ে যায়- অতঃপর যে কারণে তিনি কিছুক্ষণ পরে তাঁর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। কেন সন্দিহান হন, অথবা লেখকের ভাষায়- “আবদুল মজিদের অস্তিত্ব পুনর্বার ভেঙে পড়তে চায়”- এটাই সম্ভবত উপন্যাসের প্রস্তাবনা, যার জন্য তিনি পুরো একান্ন পৃষ্ঠার একটা ক্ষুদ্র অথচ গভীর রঙের দুঃখ, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ আর নতুন স্বপ্নের প্রতিজ্ঞার চিত্র একে যান নিরবচ্ছিন্নভাবে। বর্ণনা করার সুবিধার জন্যে বলা যায়, আসলে উপন্যাসটা শুরু হয়েছে ২২ পৃষ্ঠা থেকে, যখন আমরা জানতে পারি বদু মওলানার ছোট ছেলে যখন তাঁর বাবার সমর্থিত দলের পুনরায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং হরতাল পালনে আবুল খায়ের, অর্থাৎ বদু মাওলানার ছোট ছেলে মহল্লার সবাইকে ধন্যবাদ জানান। নির্দোষ এই ধন্যবাদে কোন কালিমা নেই, কিন্তু দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেই- বদু বা আবুল খায়েরের আসল রূপ দেখিয়ে দেয় উপন্যাসিক। এখানে দ্রষ্টব্য, সেই হরতাল হচ্ছে আশির দশকের সেই উত্তল সময়ের সরকারবিরোধী হরতাল, যেখানে স্বাধীনতাবিরোধীদের সক্রিয় অবস্থানে পীড়িত ছিল পুরো দেশ, এবং পীড়িত আবদুল মজিদও।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বদু মাওলানা যে বিরোধীশক্তির সহায়ক ছিলেন, তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যখন লেখক বলেন-


একাত্তর সনে বদু মাওলানা নরম করে হাসত আর বিকেলে কাক ওড়াত মহল্লার আকাশে। এক ঠ্যালা মাংস নিয়ে ছাদে উঠে হেত বদু মওলানা আর তার ছেলেরা। মহল্লায় তখনো যারা ছিল, তারা বলেছিল, বদু মওলানা যে মাংসের টুকরোগুলো আকাশে ছুড়ে দিত, সেগুলো ছিল মানুষের মাংস।

এই জায়গাতে এসেই আমরা বুঝতে পারি, কেন আবুল খায়েরের ভাষণে বিচলিত আবদুল মজিদ। মিলিটারিরা মহল্লায় আসার সাথে সাথে বদু হাত মেলায় মিলিটারিদের সাথে, এবং নয় মাস ধরে চালায় হত্যাযজ্ঞ এবং ধর্ষণ, যার শিকার মজিদের বোন মোমেনা। কাহিনীসূত্রে জানা যায়, বদুর নেতৃত্বে রাজাকারবাহিনী মহল্লা থেকে তুলসী এবং জবাফুলগাছ উপড়াতে গেলে মোমেনা বাঁধা দেয় এবং ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে এক রাজাকারকে চড় মেরে বসে। পরে তাকে আবিষ্কার করা হয় বধ্যভূমিতে।

বদু মওলানার যে নিখুঁত চরিত্র লেখক উপস্থাপন করেছেন, তা বাঙলা সাহিত্যে অনবদ্য সংযোজন। ৭১ এর বিরোধী শক্তিরা কীভাবে ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে মানুষ হত্যা করেছে, এবং নির্লজ্জভাবে মিলিটারিদের তোষামোদে বিগলিত ছিল- তাঁর জাজ্বল্য প্রমাণ এই উপন্যাস। পাকিস্তানী অফিসার দ্বিতীয়বারের মতো মহল্লায় এলে রাস্তার পাশে প্রশ্রাব করে বদু মওলানার পিঠে প্রশ্রাবে ভেজা হাত মুছে দিলে বদুর বিগলিত আচরণের যে চিত্র অংকন করেছেন, তা রাজাকারদের ঘৃণ্য চাটুকারিতার কুশ্রী রূপটা সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখকের ভাষায়,


তারা মনে করেছিল, বোতাম লাগানোর সময় ক্যাপ্টেনের হাতে প্রশ্রাব লেগে যায় এবং সে তার ভেজা হাত নিজের পকেটে রুমাল না থাকায় বদু মওলানার পিঠের কাপড়ে মোছে। কিন্তু তারা পরে জেনেছিল যে তাকে ক্যাপ্টেন ছুঁয়েছিল এই ব্যাপারটির প্রতি সম্মান দেখানো এবং স্মৃতি ধরে রক্ষার জন্যেই সে তার জোব্বাটি সংরক্ষণ করেছিল।

এখানেই শেষ নয়। পাঠক আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেন, সাতজন মানুষকে মেরে কবর দেয়ার পর ভয়ে বিহব্বল মহল্লা যখন নিশ্চুপ, তখন আবুল খায়েরের কান্না শোনা যায় তার কুকুর ভুলুর মৃত্যুর কারণে!! উৎকণ্ঠিত বদু তখন ভুলুকে সমাহিত করে সে মৃতদের পাশে, যাদেরকে পাকবাহিনী হত্যা করেছে!! কী নির্মম সত্য, কিন্তু এই ছিল একাত্তরের বিয়োগগাঁথার বাস্তব দৃশ্যপট। বদু ঘোষণা করে, এই কবরে কোন পীর নাই, কুত্তা আছে। সাত সাতটি লাশের থেকে “কুত্তা” গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় তার কাছে। সেই স্মরণে মজিদ লক্ষ্য করে, অপরাহ্ণের আকাশ উইপোকায় ছেয়ে আছে, এবং কাকের চিৎকারে তখন মনে হয় যেন নীরব সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ছে। এই কাক হয়তো সেই কাক, যে কাক ৭১ এ বদু মওলানার ছাদের ওপর উড়ত মাংসের লোভে, এবং এখনো সেই কাক সব বদু মওলানার পকেটের আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসছে বাইরে- সেই রুপকটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

স্বাধীনতাবিরোধীদের ধর্মের অপব্যবহার এবং তৎকালীন সময়ের ধর্মের অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের একটা সামান্য কিন্ত শক্তিশালী চিত্র লক্ষ্য করা যায় উপন্যাসের বেশ কয়েকটি জায়গায়। প্রথমত, লেখকের বর্ণনাতে দেখা যায়, মায়ারানীর পুজার মণ্ড বিতরণের কাহিনী- যেখানে প্রাঙ্গনে অপেক্ষমাণ বালক বালিকাদের ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ব্যাপারটা তুলে ধরে, এবং দ্বিতীয়ত শহিদ মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সেলিম আর মায়ারানীর অসমাপ্ত প্রেমকাহিনী শুধু প্রেমকাহিনী নয়, তা ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে দুই ধর্মের মানুষের মিলনের উপজীব্য। খণ্ড এবং অসমাপ্ত প্রেমের ছাপটি আমাদের মনে বিষাদমাখা একটা পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়, এবং মায়ারাণি ক্রমাগতভাবে থেকে যায় কুমারী।

মুক্তিযুদ্ধকালীন আরও কিছু খণ্ডচিত্র এসেছে এই উপন্যাসে। ধর্ষণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমন ঘৃণার বাণ দিয়ে সুচারুভাবে সাজিয়েছেন তাঁর শব্দমালা- পড়ামাত্র সেই ঘৃণার রেশ ছড়িয়ে পরে পাঠকের মধ্যে। শহীদুল জহির লিখেছেন,


মহল্লার প্রতিটি বালক এবং বালিকার কাছে, পুরুষ এবং রমণীর কাছে যেন এই প্রথম উদঘটিত হয়েছিল যে, জগত সংসারে একটি ব্যাপার আছে, যাকে বলাৎকার বলে। তারা আজীবন যে দৃশ্য দেখে কিছু বোঝে নাই- যেখান একটা মোরগ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মুরগিকে- মহল্লায় মিলিটারি আসার পর তাঁদের মনে হয়েছিল যে, প্রাঙ্গনের মুরগির মতো তার মা এবং কিশোরী কন্যাটি, পরিচিত ভালোবাসার স্ত্রী, তাদের চোখের সামনে প্রাণভয়ে এবং অনভিপ্রেত সহবাস এড়ানোর জন্যে ছুটে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটি এমন মর্মান্তিক তাদের জন্যে জানা থাকে যে, তাদের বিষণ্ণতা ছাড়া আর কোন বোধ হয় না।

অসহায়ত্বের কী শীতল উপস্থাপন। মানুষ যখন প্রতিরোধহীন, তখন সে কিছুই করতে পারে না নিয়তিকে আলিঙ্গন করা বাদে। সেই নিয়তি কতোটা ভয়াবহ আর নিষ্ঠুর- তাই ফুটে ওঠে। যেন, তাদের বিষণ্ণ লাগে কারণ, তাদের মনে হয় যে, একমাত্র মুরগির ভয় থাকে বলাৎকারের শিকার হওয়ার আর ছিল গুহাচারী আদিম মানবীদের। গুহাচারী আদিম মানবীরা বাস করতো গুহাচারী মানবের সাথে, কিন্তু একাত্তরেও সেই মানবের বংশধরেরা বেঁচে ছিল আশ্চর্যভাবে এবং তাদের অগণিত কুকর্মের পরও তারা আবারও আসন গেড়েছে, জাতির পতাকা আবার খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন।

ঘটনাপ্রবাহ যদি মুক্তিযুদ্ধেই শেষ হয়ে যেত, তাহলে হয়তো আমরা একে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিশেবে অভিহিত করতে পারতাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধেই এই উপন্যাস শেষ হয় না, এবং হয়তো এই ঘটনাপ্রবাহ এখনো শেষ হয় নি। আজিজ পাঠান, সে ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দলের একজন নেতা- তা পরিষ্কার হয় যখন রাজাকারেরা তার বাসার নৌকাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। যুদ্ধের সময় আজিজ পাঠান আত্মগোপন করে ছিল, এবং সে ফেরার পর মহল্লার মানুষ তাকে গ্রহণ করে আন্তরিকভাবে। অন্যদিকে বদু মওলানাকে কেউ গ্রহণ করে না, অমানুষিক ঘৃণায় এবং প্রতিবাদে মজিদের মা তাকে ধিক্কার দেয় এবং বলে “থুক দেই তোর মুখে।“ কিন্তু তাদেরই আবার মহল্লায় প্রত্যাবর্তন দেখে বিস্মিত হয়ে মজিদ যখন যায় আজিজ পাঠানের কাছে, তখন পাঠান তাকে বলেন, “রাজনীতিতে চিরদিনের বন্ধু অথবা চিরদিনের শত্রু বলে কেউ নেই”, তাই ভুলে যেতে বলে অতীতকে। তার জন্যেই হয়তো লেখক পাঠানের প্রত্যাবর্তনের সময় লিখেছিলেন, “কিন্তু পরবর্তী সময় ঘটনা এমন আকার নিয়ে ঘটে, যাতে করে মহল্লার লোকদের মনে হয় যেন বদু মওলানা, আজিজ পাঠানের সম্পত্তির জিম্মাদারি গ্রহণ করেছিল মাত্র”!!!! বদু যখন ফিরে আসে দুই বছর পর মহল্লায়, মোমেনার মা যখন অসীম ক্রোধ আর ঘৃণায় মুখে “থুক” দেয়ার কথা বলে, তখন নেতা আজিজ পাঠানই বদুকে সান্ত্বনা দেন, কাইন্দেন না বলে!!

তিনি আরও বলেন, তার নেতা যেহেতু বদু মওলানাদের মাফ করেছে, তার নিজের কোন প্রতিহিংসা নেই। আমরা এখন হয়তো অনেকেই জানি, মূল নির্দেশটি কী ছিল, কিন্তু তৎকালীন এই অপপ্রচারণার ভার সইতে হয়েছে, যার জন্যে এখন কড়ায় গণ্ডায় মাশুল দিতে হচ্ছে।

এই সুযোগ গ্রহণ করেই বদু কিংবা তার ছেলে আস্কারা পেয়ে যায়, পেয়ে যান রাজনৈতিক দলের স্বাধীনতা। এমন একটি দল, যেটা মুক্তিযুদ্ধের সময় কাজ করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী হয়ে। এমনকি তিনি, বাঁ তার দল এই দুঃসাহস দেখান যে, আবদুল গনি রাজাকারকে তিনি দাবী করেন শহিদ হিশেবে, যিনি মারা গিয়েছিলেন গণহত্যার জের ধরে মুক্তিকামী মানুষের ক্রোধে।

কিন্তু মজিদ ভুলত পারে না সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা, স্তন উপড়ে ফেলা তার বোনের লাশের কথা, যেমন আলাউদ্দিনের মা ভুলতে পারে না তাঁর ১৩ বছরের শহিদ ছেলের কথা। আবদুল গনি নামের রাজাকারকে যখন মেরে ভুলুর কংকালের সাথে বেঁধে ফেলে আসা হয় নদীতে, তখন আমরা অনুভব করি সেই রাজাকারদের প্রতি তীব্র ঘৃণার স্বরূপটি। কিন্তু আশ্চর্য, রাজনৈতিক প্যাঁচে বন্ধু শত্রু হয়ে যায়, শত্রু বন্ধু হয়ে যায় এবং মানুষ ভুলে যায়, অথবা ভুলে যায় না- লুকিয়ে রাখে। কিন্তু রক্ত দিয়ে লেখা যে স্মৃতি, তা কী আর সহজে ভোলা যায়? ভোলা যায় না। তাই মজিদ তাঁর মেয়ের নাম রাখে মোমেনা। মোমেনাকে ভুলে যাচ্ছে তার জন্যে নয়, বরং এই নামটা ভুলে যাওয়ার জন্যে নয়। মেয়ের নাম মোমেনা রাখার মধ্য দিয়ে যেন সেই দগদগে স্মৃতি না ভোলারই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মজিদ। এবং শেষে যখন মজিদ ইত্তেফাকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মহল্লা থেকে সরে আসেন, তা যেন প্রস্থান নয়। নতুন কিছুর প্রত্যয়ে নতুন পথে যাত্রা। রক্তাক্ত স্মৃতির যে হতাশা তাড়িয়ে বেড়ায়, সেটাকে অপমানিত আর নিগৃহীত না হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে শুরু হয় হয়তো নতুন যাত্রা, যে যাত্রায় তার অস্তিত্ব পুনর্বার ভেঙে পড়তে চায় রাজনীতির অসহায়ত্বের কারণে।

ডাউনলোড করুন বইটি

মূলধারা ৭১ - মঈনুল হাসান



71.1মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে একটি অমূল্য সংযোজন।লেখক মঈদুল হাসান একাত্তর সালের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পটভূমিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক,সামরিক ও কূটনৈতিক সকল মূল উপাদানকেই একত্রিত করে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস।এসব উপাদানের সংঘাত ও সংমিশ্রণে কিভাবে সফল রণনীতির উদ্ভব ঘটেছিল সেই ইতিবৃত্তই তিনি তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন এই বইটিতে।১৯৭১ সালের মার্চ হতে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত গ্রন্থটির আলোচ্য ঘটনাবলীর সময়কাল, ২৫ মার্চের কালরাতে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদের সীমান্ত অতিক্রম, সরকার গঠন, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের অন্তর্দ্বন্ধের মধ্যেও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সে সরকারের এগিয়ে যাওয়া, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রকৃত অবস্থা,শপথ গ্রহণ, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ, ইন্দিরা গান্ধীর সাথে যোগাযোগ, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যোগাযোগ,সাড়া, বহির্বিশ্বে সাহায্যের আবেদন, ভারত-পাকিস্তান টানাপড়েন, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীপূর্ণ সম্পর্ক, পাক-যুক্তরাষ্ট্র সুসম্পর্ক; এসবের মধ্য দিয়ে বাঙালির প্রতিরোধ, সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আসা, সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ, গেরিলা আক্রমণ, শক্তিবৃদ্ধি, ভারতের সহায়তা, মিত্রবাহিনীর সাথে যৌথবাহিনী গঠন,বিজয় অর্জন এসবের প্রত্যেকটি ঘটনাপ্রবাহই আলোচনা করে গেছেন লেখক তাঁর নিজস্ব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে; যাতে উঠে এসেছে অনেক অজানা অধ্যায়।এছাড়া অনেক ঘটনা ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা তিনি প্রকাশ করেছেন, যেগুলির অনেক কিছুই আজও অপ্রকাশিত, অথচ এসব ছাড়া স্বাধীনতাযুদ্ধের গতি-প্রকৃতির কোন সুসংগত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়না।এ জাতীয় বিবরণ সম্ভবত কেবল মঈদুল হাসানের পক্ষেই লেখা সম্ভব।কারণ, প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত নীতি-প্রণয়নের ক্ষেত্রে এবং তাঁর পক্ষ থেকে ভারত সরকারের উচ্চতর নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার ব্যাপারে তিনি (লেখক) ছিলেন আস্থাভাজন ব্যক্তি।১৯৭১ এর ২৫ মার্চ হতে ১৯৭২ এর জানুয়ারি পর্যন্ত ঘটনাবলীর বিবরণ লেখক তুলে ধরেছেন ২২টি অধ্যায়ে।৯০ পৃষ্ঠার পরিশিষ্ট অংশে তুলে ধরেছের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথিপত্র।কাজেই, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য জানতে বইটির গুরুত্ব অসামান্য।

ডাউনলোড করুন বইটি

আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর - আবুল মনসুর আহমেদ

1383207205


আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৬৮ সালে। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষিতে কয়েকটি নতুন অধ্যায় সংযোজন করা হয় (১৯৭৫ সালে) বইটির তৃতীয় সংস্করনে। সুতরাং বইটির নাম আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর হলেও বইটি ষাট বছর কিংবা তারও অধিক সময়ের রাজনৈতিক প্রতিবিম্ব। লেখক আবুল মনসুর আহমদ ব্যক্তি জীবনে রাজনীতির যেসব শাখা প্রশাখায় বিচরণ করেছেন, যেসব ঘটনার সাথে নিজেকে জড়িয়েছেন কিংবা ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়েছেন সেসব ঘটনার বিষদ বিবরণ নিয়েই মূলত রচিত হয়েছে আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর বইটি। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে লেখকের জন্ম বলে ফরায়েজী ও ওহাবী আন্দোলনের প্রতি বিশেষ ধরনের দূর্বলতা প্রকাশ করেই বইটির সূচনা। প্রধানত নিজ ধর্মের প্রতি বিশেষ দূর্বলতা ও ইংরেজ বিদ্বেষী জাগ্রত চেতনা শিশু মনসুর আহমেদ এর উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। যার ফলশ্র“তিতে তিনি অল্প বয়সেই ইংরেজ মনোনীত নায়েব সাহেবের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। মাত্র নয় বছর বয়সে প্রজা আন্দোলনের সাথে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে ক্রমেই নিজের ভবিতব্যকে জড়িয়ে ফেলেছেন জাতীয় রাজনীতির সাথে। ধর্ম চেতনাকে রাজনীতির সাথে উপলব্ধি করে তৎকালীন সমাজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও কর্মক্ষেত্রে মুসলমানদের (উনিশ শতকের প্রথম দিকে) অনগ্রসরতা ও বিভিন্নভাবে মুসলিম সাধারনকে হেনস্তা করা প্রভৃতি বিষয় সমূহ লেখককে আরো বেশি সক্রিয় করে তোলে। (একজন শিক্ষক ক্লাসে তাকে মিয়া সাব বলায় তিনিও শিক্ষককে বাবুজী সম্ভাষণ করেছেন। উল্লেখ্য যে, উভয় সম্বোধনই অপমানজনক)। ১৯১৪ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর প্রতি মুসলিম সমাজের অগাধ সমর্থনের প্রধান কারন দেখা যায় তুর্কি খলিফার জার্মান সমর্থন। হিন্দু ও মুসলিম জাতি উভয়েই ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, তবে নিজ নিজ ধর্মীয় আবেগকে বিন্দুমাত্র অবনমিত না করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন তারই প্রতিবিম্ব। স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা যতোটা প্রাধান্য পেয়েছে ধর্ম তার চাইতে কোন অংশে কম নয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানীর পরাজয়, তুরস্কের ক্ষমতায় এসে কামাল আততুর্ক খিলাফত রদ করলে ক্রমেই খিলাফত আন্দোলন স্থিমিত হয়ে আসে। তবে ইংরেজ ও জমিদার শ্রেণীর প্রতি বিদ্বেষ কমে না বরং তা আরো প্রকট হতে থাকে। যারফলে ধনবাড়ির বিখ্যাত জমিদার সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী নির্বাচনে একজন গরিব সাধারন নেতার কাছে পরাজিত হন। এমতাবস্থায় ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগে হিন্দু-মুসলিম স¤প্রীতি স্থাপনের জন্য বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়। যার ফলে মুসলমানরা কর্মক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পায় এবং এই চুক্তির কারনে হিন্দু সমাজ উত্তেজিত হয়ে চুক্তি ভন্ডুল করার চেষ্টা করে। অবশেষে দেশবন্ধু ও মওলানা আকরাম খাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় সিরাজগঞ্জের এক সম্মেলনে বেঙ্গল প্যাক্ট গৃহীত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনদাশ উপলব্ধি করেন হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি ছাড়া স্বরাজ সম্ভব নয়। কিন্তু ১৯২৫ সালে দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর সাম্প্রদায়িক তিক্ততা চরমভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯২৬ সালে কলকাতার বিধ্বংসী দাঙ্গা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এসময় হিন্দুনির্ভর কংগ্রেস নিরব ভূমিকা পালন করে কিন্তু মোঃ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ স¤প্রীতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যার ফলে ইংরেজদের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। জিন্নাহ বিরোধী এই ষড়যন্ত্র পরে অবশ্য মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও জিন্নাহর প্রচেষ্টায় মিটে যায়। পরে ১৯২৮ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বর্ষিক অধিবেশনে কংগ্রেস নেতা বিধানরায় মুসলমানদেরকে কটূক্তি করলে হিন্দু-মুসলিম সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা ব্যহত হয়। সেসময় প্রজাসত্ত্ব আইনের প্রশ্নে হিন্দুদের জমিদার পক্ষ অবলম্বন ও মুসলিমদের প্রজাপক্ষ অবলম্বন করায় আইন সভা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং এসময়েই বেঙ্গলপ্যাক্ট বাতিল করা হয়। এরপর কংগ্রেস থেকে মুসলমানরা বের হয়ে এসে মওলানা আকরাম খাঁর নেতৃত্বে নিখিল বঙ্গঁ প্রজা সমিতি গঠন করে ১৯২৯ সালে। এসময় কংগ্রেস নেতৃত্বের জমিদার প্রীতি প্রজা আন্দোলনে বিঘœ ঘটায়। পরে ১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধী গ্রেফতার ও ১৯৩২ সালে কংগ্রেসকে বেআইনি ঘোষনা করা হয়। অপরদিকে ময়মনসিংহ জেলায় প্রজা আন্দোলনের বিস্তৃতি বাড়তে থাকে। এসময় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সিরাজগঞ্জে প্রজা সম্মিলনী আহ্বান করেন। মূলত এই সম্মেলনের উপর ভিত্তি করেই ১৯৩৬ সালে বঙ্গীয় কৃষি খাতক আইন ও ১৯৩৭ সালে ঋণ সালিশী বোর্ড স্থাপিত হয় এবং এর মাধ্যমে রাজনীতির ময়দানে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ক্ষমতার প্রশ্নে মুসলিম সমাজ অর্ন্তদ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তা প্রশমিত করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এছাড়া বাঙ্গালী হিন্দুরা মেজরিটি শাসন ও পূর্ন স্বায়ত্তশাসন উভয়ের বিরুদ্ধে থাকায় এই দুই অধিকারের জন্য আন্দোলনও খুব একটা জমে ওঠেনি। এর মাঝেই ফজলুল হক মন্ত্রীসভা গঠন করেন কিন্তু মন্ত্রীদের অর্š—দ্বন্দ্বের ফলে হক মন্ত্রীসভার পতন হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় হক মন্ত্রীসভার বিরোদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। কিন্তু হক সাহেব ততদিনে জাতির কাছে খাঁটি বাঙ্গালি ও খাঁটি মুসলিমের সংমিশ্রনে এক নতুন নেতৃত্বের স্বপ্নের দুয়ার উম্মোচন করেন। যার ফলে এই মন্ত্রীসভার (১৯৩৮-৪০) সময়টা বাংলার মুসলমান ও কৃষকপ্রজা খাতকের জন্য বিশেষ সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের পর জিন্নাহ ও সুভাষবাবু হিন্দু মুসলিম ঐক্যের আরেকটি উদ্যোগ নিলে তাও বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি মাহাত্মা গান্ধীর বিরূপ আচরনের কারনে। এরপর বাঙ্গালি জাতীয়তাবোধে শুরু হয় সত্যাগ্রহ আন্দোলন কিন্তু আন্দোলনের একপর্যায়ে সুভাষবাবুর অন্তর্ধানে বাঙালী স্বাতন্ত্র্যের সংগ্রাম অনেকটাই স্থিমিত হয়ে পরে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক ভাবে ফজলুল হক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার উদ্দেশ্যে কাজী নজরুল ইসলামকে নামে মাত্র সম্পাদক করে আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় নবযুগ পত্রিকার প্রচলন করেন। এরপর জিন্নাহ-হক দ্বন্ধে মুসলিম লীগ থেকে ফজলুল হক প্রত্যাবর্তন করেন ও শ্যামপ্রসাদকে নিয়ে প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন পাটি গঠন করেন। এসময় ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে ভাগ্যগুনে হকসাহেব আবারো মন্ত্রীসভা গঠন করেন এবং নানাবিধ কারনে মুসলিম সমাজে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে নাযিমুদ্দিন মন্ত্রীসভা গঠন করে এবং তার সময়েই (বাংলা ১৩৫০ সাল) ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ দেখা দেয় বাংলায়। ২য় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আক্রমন প্রতিরোধের কৌশল হিসাবে খাদ্য মজুদ ও পরিবহন ধ্বংস করে ভারত সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবেই এ দূর্ভিক্ষর জন্ম দেয় বলে ধারনা করা হয়। ১৯৪৬ সালে খাজা নাযিমুদ্দিন হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলে সা¤প্রদায়িকতা নৃসংশ আকার ধারন করে এবং অবশেষে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। এসময় কলকাতাকে পূর্ববাংলার সাথে একীভূত করার জন্য হকসাহেব ও সোহরাওয়ার্দী বেশ চেষ্টা করেন কিন্তু পরে নাযিমউদ্দিন নেতৃত্বে আসার পর সে প্রচেষ্টায় ভাটা পড়ে। এসময় লিয়াকত আলী খাঁ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং বলিষ্ট নেতা সোহরাওয়ার্দীকে কোনঠাসা করে বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগ বিলুপ্ত করেন। তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন শুরু করা হয়। ১৯৪৮ সালে গান্ধীর মৃত্যুর পর ভারতের মুসলমানরা শংকিত হয় ও জিন্নাহ সাহেবের বক্তব্যে স¤প্রদায়িকতা ঝড়ে পড়ে (তিনি বলেছিলেন ভারত একজন মহান হিন্দুকে হারালো)। ঠিক এসময়েই পাকিস্তানের গভর্নর জিন্নাহ সাহেব উর্দূকেই একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষনা করেন এবং তার প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে বাংলার ছাত্রসমাজ। ১৯৫০ সালে মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী সাহেব মুসলীম লীগের একক আধিপাত্যের বিপরীতে আওয়ামীলীগ এর ব্যানারে আরেকটি সংগঠন বেগবান করতে চাইলে নানাভাবে তাদেরকে বিব্রত করা হয়। ১৯৫১ সালে নাযিমুদ্দিনও মাতৃভাষা হিসেবে উর্দূকে ঘোষনা করলে পূর্ববাংলার মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা নিরব ভুমিকা পালন করে। পক্ষান্তরে সাধারণ ছাত্র সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মুসলীম লীগের উপর গনমানুষের তিক্ততা উপলব্ধি করে ১৯৫৪ সালে নির্বাচন দেয়া হয়। এসময় ফজলুল হক রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। এসময়ই নির্বাচনী ইশতেহার হিসাবে ২১ দফা প্রণয়ন হয় ও নির্বাচনে ২৩৭ টি আসনের ২২৮ টি নিয়ে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। কিন্তু মন্ত্রীত্বের ভাগাভাগি নিয়ে হক-সরোয়ার্দী বিবাদের ফলে যুক্তফ্রন্টে ফাটল দেখা দেয়। যার সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববাংলায় ৯২ক ধারা প্রয়োগ করে গভর্নর রুপে শাসন ক্ষমতা ইস্কান্দার মির্যাকে প্রদান করে এবং আওয়ামীলীগের উপর দমননীতি চালানো হয় সেক্রেটারী শেখ মুজিব সহ অন্যান্য নেতাদেও হয়রানি ও গ্রেফতারের মাধ্যমে। পরে প্রধানমন্ত্রী মোঃ আলীর ষড়যন্ত্রে যুক্তফ্রন্ট বিলুপ্ত হয়ে যায় ও আওয়ামীলীগ দূর্বল হয়ে যায়। পরে মওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার ও আওয়ামীলীগ ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র এবং ভাসানী কর্তৃক ন্যাপ গঠন তৎকালীন চলমান রাজনীতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মির্যা মার্শাল ল জারি করে ভাসানী, মুজিব, মনসুর আহমদ সহ অনেক জনপ্রিয় নেতাকে জেলে প্রেরন করে। এর মাঝেই জেনারেল আইয়ুব রাষ্ট্রক্ষমতা নিজ হাতে তুলে নেয়। গ্রেফতার, হয়রানি ও ষড়যন্ত্রের মধ্যে ১৯৬৯ সালে গনআন্দোলনের মুখে মার্চে এসে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং ক্ষমতায় আসেন জেনারেল ইয়াইয়া। মূলতঃ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখমুজিবকে গ্রেফতার-ই গনআন্দোলনে জোয়ার এনে দেয়। পরে ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচনে পূর্বপাকিস্তানে আওয়ামীলীগ ও পশ্চিমপাকিস্তানে পিপলস পার্টির একচেটিয়া জয় দুটি আলাদা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জানান দেয়। কেন্দ্রীয় পরিষদে ৩১৩ আসনের ১৬৭ টি জিতে আওয়ামীলীগ একক মেজরিটি দল হিসাবে সরকার গঠনের দাবীদার হয়ে উঠলে পশ্চিমারা ছয়দফা বাতিলের অজুহাতে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। এসময় ভূট্টো-ইয়াইয়া যোগসাজসে ঢাকায় বৈঠক স্থগিত করে এব; বাঙ্গালীর ন্যায্য অধিকারের আন্দোলনের উপর পুলিশ গুলিবর্ষন করে। অতঃপর ৭ মার্চ জনতার সামনে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষন এবং সেদিন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষনা করা ও না করা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক, এসব ব্যাপারে লেখকের অভিমত স্থান পেয়েছে বইটির অনেক জায়গায় জুড়ে। ক্রান্তিকালে সিদ্ধান্ত দিতে মুজিবের দ্বিধাদ্বন্ধ ও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রন না করে বরং ঘটনার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েও একজন ভাগ্যবান নেতা হিসেবে মুজিবের অভূতপূর্ব সাফল্য - এসব বিষয় বেশ আলোচিত হয়েছে এখানে। অবশেষে শেখ মুজিব পাকিস্তানের নেতৃত্বে এককভাবে না নিয়ে পশ্চিমপাকিস্তান ভূট্টোর হাতে ছেড়ে দেয়ার পর মুজিবের ভাগ্য নির্ধারিত হয় ভূট্টো-ইয়াইয়ার সিদ্ধান্তের উপর। (এক্ষেত্রে মুজিবের অদূরদর্শীতার কথা বোঝানো হয়েছে এখানে)। যার ফলে, ২৫ শে মার্চ ৭১, জাতির জীবনে নেমে আসে কালোরাত। অতঃপর শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। প্রথম দুই মাস কোনঠাসা বাঙালি জাতির উপর চলে অমানুতিক নির্যাতন, পরের পাঁচমাস চলে দখলদার বাহিনীর বিরোদ্ধে বাঙালির জনযুদ্ধ, শেষের দুইমাস জনসমর্থনহীন পাকবাহিনী ও জনমসর্থিত বাঙালী ও ভারতীয় বাহিনীর মধ্যে একটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ। অতঃপর নয় মাসের ব্যবধানে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভুদয়। মূলতঃ ২৫ মার্চের নির্মম হামলা জাতির মনে যে বেগ সৃষ্টি করেছিল তা থেকে পাকিস্তান অখন্ডরাখা কোন ভাবেই সম্ভব হয় নাই। দেশস্বাধীনের পর বিভিন্ন নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে লন্ডন ও দিল্লী হয়ে ১০ জানুয়ারী ১৯৭২, শেখ মুজিবের ঢাকা প্রত্যাবর্তনে স্বাধীন বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় দুষ্টচক্রের খেলার অবসান ঘটে। অতঃপর ভারত-বাংলাদেশ স¤প্রীতি, সমাজতন্ত্র-গনতন্ত্র বিতর্কের একপর্যায়ে ১৮ বছরে ভোটাধিকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের সংবিধান রচিত হয়। এর মাধ্যমে জাতীয় অধিকারের আন্দোলনে নিবেদিত ছাত্রসমাজের মূল্যায়ন করা হলো। কিন্তু সংসদে শেখ মুজিব “অপযিশন লিডার” পদ বিলুপ্ত করায় তা সংগ্রামী বাঙালী জাতির জন্য লজ্জ্বাজনক ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগ ২৫ বছর ক্ষমতায় থাকবে বলে লেখক যে ভবিষ্যতবানী করেছিলেন তা আওয়ামী নেতাদের ক্ষমতালিপ্সতা ও অগনতান্ত্রিক আচরনের কারনে অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। বইটির বৃহত্তর অংশ জুড়ে পরিস্থিতির সাথে লেখকের অঙ্গাঅঙ্গি পদচারনায় বারবার দিয়ে এসেছে ফজলুল হকের বহুমুখী রাজনৈতিক মতাদর্শ। কখনো ইতিবাচক আবার কখনো নেতিবাচক রুপে উঠে এসেছে পূর্ববাংলার নেতাদের রাজনৈতিক চরিত্র। তবে দেশ ভাগের (১৯৪৭ সালের পূর্বে) পূর্ব পর্যন্ত ধর্মই অধিকাংশক্ষেত্রে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ করত। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই। আর বইটির শেষ অংশে রাজনীতির অবস্থা স¤পর্কে লেখকের পর্যবেক্ষন গুলোই এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি কোন সময়ের বা জাতির ৫০ বছরের সামগ্রিক ইতিহাস নয় ইতিহাসের অংশ মাত্র। শুধুমাত্র সেই সময়ে লেখক যে ঘটনাগুলোকে ছুঁয়ে গেছেন তারই বহিঃপ্রকাশ আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর বইটি।


এক জেনারেলের নীরব স্বাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক - মেজর জেনারেল (অব.) মঈনুল হোসেন চৌধুরী, বীর বিক্রম

75স্বাধীনতোত্তর আমাদের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান ইত্যাদি নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সেনা-কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ লিখেছেন। কিন্তু সে-সব গ্রন্থের সঙ্গে মেজর জেনারেল (অবঃ) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এ- বইটির তফাত হলো পূর্বোক্ত গ্রন্থগুলোর যাঁরা লেখক তাঁদের প্রায় সকলেই ঘটনাপ্রবাহের হয় ভিকটিম নয় বেনিফিসিয়ারি। তাঁদের সে অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের রচনায়, কমবেশি, ঘটেছে। অন্যপক্ষে একজন দায়িত্বশীল, কর্তব্যনিষ্ঠ, আইনানুগ ও শৃঙ্খলাপরায়ণ সেনা-কর্মকর্তা হিসেবে লেখক শেষদিন পর্যন্ত পক্ষপাতহীনভাবে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থেকেছেন। আর এই দায়িত্ব পালনের সূত্রেই খুব কাছ থেকে সবকিছুকে দেখার, উপলব্ধি করবার সুযোগ তাঁর হয়েছে। সময়ের উচিত দূরত্বে দাঁড়িয়ে নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে সে দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক তাঁর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক প্রন্থটিতে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাতীয় স্বার্থ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েও লেখক ঘটনার মূল্যায়নে তাঁর দৃষ্টিকে দেখেছেন অনাচ্ছন্ন, দায়বদ্ধ থেকেছেন ইতিহাসের প্রতি।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাতীয় স্বার্থ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েও লেখক ঘটনার মূল্যায়নে তাঁর দৃষ্টিকে দেখেছেন অনাচ্ছন্ন, দায়বদ্ধ থেকেছেন ইতিহাসের প্রতি।
এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই রচনাটি যখন ধারাবাহিকভাবে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল তখনই তা সবার আগ্রহ ও মনোযোগ আকর্ষণ করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক চালচিত্র বুঝতেও বইটি পাঠকদের সহায়তা করবে বলে আমাদের ধারণা।


গেরিলা থেকে সন্মুখ যুদ্ধে (উভয় খন্ড একত্রে) - মাহবুব আলম

imgrok_1835গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অনন্য দলিল।

মূলতঃ স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ের একজন গেরিলা যোদ্ধার ডায়েরী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা কমান্ডার মাহবুব আলমের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লেখা।
১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারিখের ঘটনা দিয়ে বইটি শুরু হয়েছে এবং তারপরই চলে এসেছে ১৬ ডিসেম্বরের কথা আর এরপর ধারাবাহিকভাবে এসেছে লেখকের যুদ্ধে যাবার ও বিভিন্ন অপারেশনে আংশ নেয়া ও অন্যান্য কথা।
এতে মূলত চাউলহাটি ইউনিট বেসের মুক্তিযোদ্ধাদের দৈনন্দিন জীবন এবং অপারেশনের বর্ণনা বিধৃত হয়েছে।
লেখক মাহবুব আলম ছিলেন এই ইউনিটের একজন সফল কমান্ডার।
বইটি দুই খণ্ডে সমাপ্ত হয়েছে।


ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা - রতনতনু ঘোষ



page001 (3)ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত যে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবৃত্ত তৈরি হয়েছে তাতে বাঙালির আকাঙ্ক্ষা, জাগরণ, সংগ্রাম, বিকাশ ও বিস্তার লক্ষণীয় বিষয়। এদিকগুলো প্রবন্ধক্রমে উঠে এসেছে কালক্রমিক বিষয়-বৈচিত্র্য বহুমাত্রিক নিয়ে। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও স্বকীয় মূল্যায়নের আলোকেই প্রবন্ধগুলো রচিত। গ্রন্থটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেমন আছে তেমনি জাতীয় পর্যায়ে বাঙালির স্বকীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং স্বাধীন স্বদেশের লক্ষ্য নির্ণয়েরও তা নির্দেশক হতে পারে। ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা - এ তিনটি বিষয়-পর্বের ভিন্নমাত্রিক চিন্তাসমৃদ্ধ বক্তব্য পাঠকের উপলব্ধি ও বিবেচনার বিষয় হতে পারে আমাদের আর্থ-সামাজিক, ভাষিক-সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে।

ডাউনলোড করুন বইটি

ভাষার লড়াই বাঁচার লড়াই - আতিউর রহমান (নওরোজ কিতাবিস্তান)


ভাষার লড়াই বাঁচার লড়াই - আতিউর রহমানবাঙালির জীবনে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এক কালজয়ী ঘটনা। ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষ আসলে একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বদেশ-চিন্তার যুক্তিগ্রাহ্য পটভূমি তৈরি করে। সেই পটভূমিতেই দাঁড়িয়ে যায় বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলনে সাধারণ মানুষও অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তাদের চাওয়া পাওয়ার আদলে তাই স্বদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি হবে সে প্রত্যাশা বাঙালি মাত্রই করতে পারেন। সেই প্রত্যাশা ছিল বলেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে এমন বিপুলহারে অংশ নিয়েছিল।
কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সেই অন্তর্নিহিত চেতনাকে কি আমরা স্বদেশের উন্নয়ন ভাবনায় যুক্ত করতে পেরেছি? পরদেশী উন্নয়ন চিন্তাই কি এখনও আমাদের সকল উন্নয়ন প্রচেষ্টার মূলে নয়?

ডাউনলোড করুন

বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ: সমকালীন সাংবাদিকের দৃষ্টিতে - আমির হোসেন



71লেখক আমির হোসেন পেশায় একজন সাংবাদিক। পেশাগত কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘটনাবলী খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে লেখকের। এই বইতে লেখক লিপিবদ্ধ করেছেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম আর ত্যাগ তিতিক্ষার উপাখ্যান।



মুক্তিযুদ্ধের গল্প - আবুল হাসনাত সম্পাদিত


 মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত মোট ২৬টি গল্প নিয়ে এই সঙ্কলন।

page001 (1)

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধঃ ব্রিটিশ দলিলপত্র - মাসুদা ভাট্টি



page001"বাঙালির মুক্তিযুদ্ধঃ ব্রিটিশ দলিলপত্র" গ্রন্থে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য দ্বিতীয় ও কঠিন সংগ্রামের বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছে। উপমহাদেশে ব্রিটিশ দূতাবাসগুলো থেকে লন্ডনে ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিসে পাঠানো প্রতিদিনকার ''পাকিস্তান পরিস্থিতি রিপোর্ট"; ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিস থেকে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসসমূহে পাঠানো "পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ-পরিস্থিতি" বিষয়ক নির্দেশাবলী; ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিস, কেবিনেট অফিস এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতর হতে উপমহাদেশ সম্পর্কে গৃহীত বিভিন্ন নীতি; উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্ট; জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব লাভের পথে বৃহৎ শক্তিবর্গের টানাপড়েন সম্পর্কীয় দলিলপত্রই এই গ্রন্থের মূল ভিত্তি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রবাসী বাঙালিরা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বিশ্বে দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এপ্রিল মাসে মুজিবনগর সরকার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করে বহির্বিশ্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। এই গ্রন্থে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার ও পাকিস্তান সামরিক সরকারের কূট-রাজনীতির স্বরূপও বিধৃত হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলাস-হিউম যেসব গোপন কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছিলেন তা এই গ্রন্থের অন্যতম মূল প্রতিপাদ্য।

ডাউনলোড করুন বইটি

Contact

Subscribe

Donec sed odio dui. Duis mollis, est non commodo luctus, nisi erat porttitor ligula, eget lacinia odio. Duis mollis

© 2013 Ebook Craver. All rights reserved.
Designed by SpicyTricks