মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০১৫

তিরিশের দশকের অন্যতম আধুনিক কবি। জীবনানন্দের মৃত্যুর পর, তাঁর বেশ কিছু সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর ছবির প্রয়োজন হয়। সে সময়ে ছবি খুঁজতে গিয়েই আবিষ্কৃত হয় চারটি ট্রাঙ্ক, যা ছিল গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের পা-ুলিপিতে পরিপূর্ণ। তাঁর রচিত গল্প-উপন্যাস পরবর্তী সময়ে চার খ-ের সমগ্র হিসেবে প্রকাশিত হয়। ফলে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, কেন তিনি এসব সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করলেন না। যতদূর জানা যায়, কবি জীবনানন্দ যে নব্য ধারায় কাব্য রচনা করেছেন তা তৎকালীন সময়ে যথেষ্ট সমালোচিত ছিল। জীবনানন্দ দাশ মানুষের অন্তর্গত বেদনা, হতাশা, ব্যর্থতা, নৈঃসঙ্গবোধকে এক বিমূর্ত কল্পলোকে অনুভব করেছেন এবং চিত্রকল্পের মাধ্যমে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। নাগরিক জীবনে একাকী মানুষের ব্যর্থতায় মূল সংকট প্রতিভাত করেছেন। এর মূলে তিনি যৌনতাকে উল্লেখ করেছেন। যার ফলে ব্যক্তিজীবনে বারংবার হোঁচট খেয়েছেন। এমনিতেই তিনি ছিলেন অন্তমুখী। তাঁর ওপর তৎকালীন সাহিত্যিকদের তীব্র কটাক্ষের বিপরীতে নিশ্চুপ থেকেছেন জীবনানন্দ দাশ। চাকরিতে, শিক্ষকতায় এমনিতেই মন বসাতে পারতেন না। তার ওপর কবিতার অশ্লীলতার দায়ে চাকরিচ্যুত হওয়া। প্রায়ই বেকার থাকার কারণে ব্যক্তিজীবনে দাম্পত্যজীবনে জীবনানন্দ অসুখীই ছিলেন। শিল্পের সঙ্গে আপস করতে না চাইলেও অবস্থার চাপে পড়ে কখনো দিশেহারা হয়েছেন। গল্প-উপন্যাসে তিনি যে বার্তা দিতে চেয়েছেন তা হলো মানুষের জীবনে মূল্যবান হলো টাকা। মানুষের মন নামক স্বত্ব সেখানে বিক্রীত। টাকাই মানুষের সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। সব মানুষ ভালো থাকতে চায়। এর উৎস টাকা। কেবলই টাকা। কিন্তু জীবানন্দ দাশ এ জীবনে সুখ পাননি। তাই মানুষের পৈশাচিক ব্যবহার, অবহেলাকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা অযথাই লক্ষ্যহীন জীবনকে বয়ে চলার আনন্দে তিনি আনন্দিত হতে পারেননি। না ছিল তার বহুরূপী মুখোশ, না ছিল টাকা। তাই সমাজে তার অবস্থান ছিল হতাশাগ্রস্ত, কাপুরুষ, নির্জনতম ব্যক্তি। প্রকৃত পক্ষে কেউই তার ভেতরকার সত্তাকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে পারেননি। জীবনানন্দ দাশ গদ্যরচনায় হাত দেন কাব্য রচনাকালের বছর পাঁচেকের মধ্যে। তা ১৯৩২-৩৩ সালের দিকে। জীবনানন্দের উপন্যাসে সংঘাত আছে, গভীর জীবনদৃষ্টি আছে। এ সংঘাত সমাজের সঙ্গে নয়, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির নিজের অস্তিত্বের সংঘাত। তাই মাল্যবান, উৎপলা, হেম, কল্যাণী সবার বেদনাই পৃথক, অস্তিত্বের সংকটও ভিন্ন। তাদের একাকিত্ব, বেদনার গভীরতা প্রকাশ করতে গিয়ে জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ অংশ উহ্য রয়ে গেছে। প্রায়ই জীবনানন্দের উপন্যাসের নায়কেরা বিবাহিত, এক সন্তানের পিতা। কিন্তু এ সন্তানেরা উপন্যাসে উপেক্ষিত। দৈনন্দিন জীবন, নারী-পুরুষের কর্মময় জীবনের ছবি, আবেগী-সংসারী মনোভাব এখানে অনুপস্থিত। এ যেন কেবল থাকার জন্যই থাকা। তাঁর সৃষ্ট নায়কেরা আরামে থাকতে চায়, স্ত্রীসঙ্গ চায়। কিন্তু তারা উদ্যমী নয়। প্রতি উপন্যাসেই লেপের উষ্ণতার আড়ালে জীবনের গভীরতর স্বাদের প্রসঙ্গ এসেছে। সংকটের মূলে দারিদ্য। এর ফলেই মাল্যবান-উৎপলা, হেম-কল্যাণী, স্বামী-স্ত্রী হয়েও সর্বদাই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেছে। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের মূলে আর্থিক সঙ্গতিকেই গুরুত্ব দেন তিনি। তাই জীবনসায়াহ্নে এসেও উৎপলার সচ্ছল মেজদা-বৌঠান সুখী। অন্যান্য উপন্যাসেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। এ ধারা থেকে কিছুটা বের হয়ে আসেন ‘সুতীর্থ’ উপন্যাসে। সুতীর্থ মাল্যবান বা হেমের মতো নয়। সে ভাগ্য পরিবর্তনে সচেষ্ট। তারপরও মানুষের অন্তর্গত বেদনাকে তিনি একইভাবে অনুভব করেছেন। সুতীর্থকে তিনি প্রাণশক্তি দিয়েছেন; কিন্তু বৈরীবিশ্বেও নোংরা বোধের চক্রে তা নিয়ত দ্বিধাগ্রস্ত।‘জলপাইহাটি’ সেদিক থেকে কিছুটা প্রতিবাদী। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র নিশীথ সেন, মধ্যবিত্ত। স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে জলপাইহাটি গ্রামে বাস করে। স্ত্রী সুমনা রোগাক্রান্ত। জীবিকার তাগিদে নিশীথ সেন শহরে আসে। মফস্বলের গ-ির বাইরে জীবনকে খোলা চোখে দেখতে গিয়ে, সমাজের, রাষ্ট্রের বড় ফাঁকি চোখে পড়ে তাঁর। জীবনকে, দাম্পত্য জীবনকে তিনি এক উৎকট রূপে প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনো মনে হয়েছে হয়তো প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিজীবন এমনই আবার পরক্ষণেই এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছেন। যে সংকট নিজে অনুভব করেছেন সেটা এতটা খোলামেলা প্রকাশিত হোক তা হয়তো চাননি জীবনানন্দ দাশ। বর্তমান সময়ে এ উপন্যাসগুলো পাঠে কখনোই শিল্পমান বর্জিত গদ্যসম্ভার বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এখানে জীবনের গভীরতা আছে। আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট আছে। অনেকে বলতে পারেন, সংকট থেকে উত্তরণের পথ জীবনানন্দ দেখাতে পারেননি। তাদের বলতে চাই জীবনানন্দ মানুষের বোধকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। জাগ্রত ব্যক্তি মাত্রই আপন কর্তব্য অনুভব করতে পারবেন। যদি পারা যায় তবে কথাশিল্পী জীবনানন্দের সার্থকতা। (ফারহানা সুলতানা)
বুধবার, ৬ মে, ২০১৫
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে কবি জীবনানন্দ দাশ নিহত হন। ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ এই কবিতাটি যিনি লিখেছিলেন তিনি হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের এক অমর কবি জীবনানন্দ দাশের মা কুসুম কুমারী রায়। জীবনানন্দ দাশের জন্ম বরিশাল শহরে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯। মৃত্যু ২২ অক্টোবর কলকাতায় (ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে তিন দিন পর হাসপাতালে মৃত্যু হয়)। তিনি ছিলেন কাজী নজরুলের সমবয়সী। জীবনানন্দ দাসই লিখেছিলেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজতে যাই না আমি।’ আজ থেকে ৭৮ বছর আগে লিখেছেন কালজয়ী এবং সকল সময়ের আধুনিক কবিতা ‘বনলতা সেন।’ যা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম সৃষ্টি। রবীন্দ্রত্তোর বাংলা কবিতার জগতকে যাঁরা সমৃদ্ধ করে গেছেন জীবনানন্দ দাশ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। জীবনানন্দ দাশের পূর্ব পুরুষের বাড়ি ছিল ঢাকার বিক্রমপুর পরগনার পদ্মাতীরবর্তী গুয়াপাড়ায়। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার ছোট সন্তান। তাঁর ডাক নাম ছিল ‘মিলু’। মিলু ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁকে চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য বাবা-মা নিয়ে যান লখেœৗ, আগ্রা এবং গিরিধিতে। পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত বরিশালে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন সে সময়ের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। ছিলেন ব্রহ্মসমাজের অনুসারী। তিনি তাঁর নাম থেকে গুপ্ত উপাধি বাদ দেন। এর পর থেকে তাঁর পরবর্তী বংশধররা দাশ উপাধি ব্যবহার করেন। মা ছিলেন রায় পরিবারের মেয়ে। জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন স্কুল শিক্ষক (১৮৬৩-১৯৪২)। তিনি একজন ভাল প্রবন্ধকার এবং ‘ব্রহ্মবাদি’ সাময়িকীর প্রকাশক ছিলেন। জীবনানন্দের বয়স যখন ৮ বছর তখন তাঁকে বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলে ৫ম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। ১৯১৫ সালে তিনি ওই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন প্রথম বিভাগ নিয়ে। এরপর কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ সালে ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে তিনি অনার্স পাস করেন। ১৯২১ সালে এমএ করেন দ্বিতীয় বিভাগ নিয়ে। একই সময় তিনি আইন পড়েন। এ সময়ই তিনি কলকাতা সিটি কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপর চলে আসেন বাগেরহাট পিসি কলেজে। সেখানে ভাল না লাগায় চলে যান দিল্লী। সেখানে যোগ দেন রামজোস কলেজে। সেখানে অধ্যাপনা করা অবস্থায় ছুটিতে বরিশাল আসেন। এ সময় (১৯৩০ সাল) তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন লাবণ্যপ্রভা গুপ্তের সঙ্গে। বিবাহজনিত দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে দিল্লীর ওই কলেজ থেকে তাঁর চাকরি চলে যায়। এর পর তিনি যোগদান করেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। তাঁর সময়ই ১৯৩৫ সালে ব্রজমোহন কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফিলেশন লাভ করে। এ সময়ই তিনি তাঁর বিখ্যাত সনেট কবিতা ‘বনলতা’ সেন রচনা করেন। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় নোয়াখালী এবং ত্রিপুরায় বহু লোক নিহত হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার পেশায় যোগ দেন। তিনি এ সময় রচনা করেন ‘হিন্দু-মুসলমান’ কবিতাটি। একই সময় তিনি ‘স্বরাজ’ নামের একটি পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। জীবনানন্দ দাশের জীবদ্দশায় ২শ’ ৬৯টি কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রয়াণের পর আরও ১শ’ ৬২টি কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। ভোরের নির্মল আকাশ, শিশির ভেজা ঘাস, ধানের ক্ষেতের উদ্দাম হাওয়ার মতন, নদীর চরের চিল ডাকা বিষণ দুপুর প্রকৃতির নানা বর্ণবৈচিত্র জীবনানন্দের কবিতায় ধরা দিত। ১৯৫৩ সালে তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫৫-তে তাঁর লেখা ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ মরণোত্তর আকাদেমী পুরস্কারে ভূষিত হয়। ১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর বিকেলে তিনি ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ৮ দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ : ঝরা পালক (১৯২৭), ধূসর পা-ুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহান পৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪), রূপসী বাংলা (লেখা ১৯৩৪, প্রকাশ ১৯৫৭), বেলা অবেলা (১৯৬১), সুদর্শনা (১৯৭৩), আলো পৃথিবী (১৯৮১), মনোবিহঙ্গ (১৯৭৯)। উপন্যাস ও গল্প : পূর্ণিমা, কল্যাণী, চারজন, বিরাজ,সতীর্থ, বাঁশমতির উপাখ্যান, প্রীতিনীড়, কারু-বাসনা, মৃণাল। তাঁর ছোটগল্প একান্ত কামনার বিলাস, সঙ্গ, নিসর্গ, রক্তমাংসহীন, জামরুল তলা, মেয়ে-মানুষ, পূর্ণিমা, নকলের খেলা, হাতের তাস, ছায়ানট, চাকরি নাই, উপেক্ষার শীত, বই, মহিষের শিং, বৃত্তের মত, সাধারণ মানুষ, পালিয়ে যেতে ইত্যাদি যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পায়। জীবনানন্দ দাশ ইংরেজীতে অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। জীবনানন্দ দাশ তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দু’টি ব্যতিক্রমী ধারা, জীবন এমনই যা আমরা লুকাতে চাই তাই বাস্তবতা, কিন্তু শ্রোতার অসামঞ্জস্য ও ভঙ্গুর জীবন ব্যবস্থা কবির কখনও সফলতা অথবা শ্রোতার কল্পনা। কবিতা কখনই বাস্তবতার পরিপূর্ণ কাঠামো ধারণ করতে পারে না। আমরা নতুন জগতে প্রবেশ করি।'